Homeসাহিত্যআরামকেদারা - রত্না চক্রবর্তী'র ছোটগল্প

আরামকেদারা – রত্না চক্রবর্তী’র ছোটগল্প

ছোটগল্প
গল্প-আরামকেদারা
রত্না চক্রবর্তী
অপুর দিম্মু মা’কে বলেন “তোর এই ছেলেকে এখানে সেখানে যেতে দিস নি, বড্ড রাশ হালকা ছেলে। একটুতেই হাওয়া বাতাস লেগে যায়, ওই রোজ যে জ্বর হয় আর ওই ভুল দেখা সবই ওই কারণে। দাদাই কাগজ পড়তে পড়তে হাসেন, বলেন ” ছেলেটা ওর বাবার ঠান্ডার ধাত পেয়েছে আর খুব কল্পনাপ্রবণ আর কিছুই নয়।,হাওয়া বাতাস সব বাজে কথা। “
যেটাই হোক অপু কিন্তু সত্যি অনেক কিছু দেখতে পায় যা আর কেউ দেখতে পায় না। সে একা থাকে ফ্ল্যাটে বসুমতিদিদার কাছে, মা বাবা অফিস যান, বসুদিদা সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অবধি তার কাছেই থাকেন। স্নান করান,খাওয়ান, গল্প বলেন, গান শোনান,নখ কেটে দেন। বসুদিদা আঁকতেও পারেন। বইয়ের মত নয় অন্যরকম, চক খড়ি দিয়ে আঁকেন, রাজপুত্র, পক্ষীরাজ, রাক্ষস, দৈত্যপুরী, যাদুকর আরো কত্ত কি! খুব সুন্দর। দুপুরে খেয়ে উঠে বসুদিদা অপুকে ঘুম পাড়াবার জন্য কাছে নিয়ে শোন, গল্প বলতে বলতে নিজেই ঘুমিয়ে যান তখন অপু চুপিচুপি উঠে বসে, অপু নিজের চশমাটা পরে তারপর খাটের পাশের জানলায় বসে বাইরেটা দেখে, আকাশ, গাছপালা, কুকুর, অলস বিড়াল, কারেন্টের তারে বসা লেজঝোলা পাখি। দু একটা বাসনওয়ালা ছাড়া মানুষ বড় একটা দেখতে পায় না।
ফাঁকা পার্কে শুধু দেখে একটা মেয়েকে, সে একটা সাদা নেটের সুন্দর ফ্রক পরে দোলনায় দোলে,খুব জোরে, ভারী অদ্ভুত লাগে, একএকবার মেয়েটাকে দেখা যায় একএকবার আর দেখা যায় না! বসুদিদা চারটের সময় যখন ঘুম থেকে ওঠে তখন আর মেয়েটা থাকে না। বিকেল সাড়েচারটেয় পার্ক খুল্লে বসুদিদার সাথে গিয়ে কোনদিনও মেয়েটাকে দেখে নি। বসুদিদাকে বলেছে “বন্ধ পার্কে কি করে আসে মেয়েটা? কোথায় যায়! ” বসুদিদা বলে “ও তবে নিশ্চয়ই দিনপরী, দোল খেতে আসে। ” বসুদিদা ছাড়া অপু আর কাউকে বলে না, ও বলে বলে জেনে গেছে সব্বাই বলবে “দুপুরের চড়া রোদে চোখ ধাঁধিয়ে গিয়ে চোখের ভুল। ” অপুর চোখ এমনিতেই খারাপ, চোখে এই বয়সেই চশমা ও দূরের জিনিস দেখতে পায় না। তাই এক বসুদিদা ছাড়া আর কেউ তার কথা বিশ্বাস করে না। বসুদিদাই তার সাথি। তবে বসুদিদার তো সকাল আটটা থেকে রাত আটটা অবধি ডিউটি, তারপর বাড়ি চলে যায়।
অপু এমন অনেক কিছু দেখে। অনেকদিন রাতে মাম্মা ঘুমিয়ে যাওয়ার পর তার চোখ গেছে পায়ের দিকের খোলা জানলার পাশের কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে। সে দেখে গাছের ডালে একটা ছোট্ট মানুষ বসে পা দোলাচ্ছে, তারপর একসময় হুহু হাওয়া বয় আর ছেলেটা আকাশে উঠে চাঁদের দিকে উড়ে গিয়ে মিলিয়ে যায়। বাবাইকে বললে বাবাই বলে ” ওটা রাত জাগা পাখি।”
কিন্তু দিম্মুর বাড়ি যেটা ঘটল সেটা কে কিন্তু যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মাম্মার এক জেঠামশাই ছিলেন, তিনি দিম্মুর বাড়িতেই নাকি থাকতেন, মাম্মাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনি যখন মারা যান তখন মাম্মা বেশ ছোট। সেই বড়দাদাইয়ের একটা প্রিয় আরামকেদারা আছে। ওটা নাকি তাঁর খুব প্রিয় ছিল। দিনরাত ওটাতে বসে শুয়ে থাকতেন। কতদিন রাতেও ওটাতেই ঘুমিয়ে গেছেন। এখন ওটাতে দাদাই বসে সকালে আর কখনো কখনো সন্ধ্যেতে। অপু ছুটিতে দিম্মুর বাড়ি গেছে, কদিন থাকবে, মাম্মা চলে যাবে ।এখানে কি সুন্দর গাছপালা, কত পাখি ডাকে সকালে, অপু স্কুলের জন্য বাড়িতেও ভোরে উঠে এখানে তো আরোই ভোরে উঠে।
অপু ঘুম থেকে উঠে বাইরে এল, দেখে দাদাই ও আজ উঠে পড়েছে, উঠোনে গাছতলায় আরামকেদারায় বসে আছে পুবদিকে মুখ করে, আকাশ কমলা এক্ষুণি সূর্য উঠবে বোধহয়। অপুর মনে হল দাদাই যেন ধ্যান করছে। অপু আর উঠোনে নামল না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল সূর্যের ঘুম ভাঙা। টুপ করে হঠাৎ মুখ দেখালো সে। দারুণ!! আরামকেদারায় দাদাই ও হাত তুলে সূর্য প্রণাম করলেন। ভিতর থেকে কাশির শব্দ পেল অপু, দাদাইয়ের!! অপু ভিতর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখে দাদাই পাশ ফিরে শুয়ে কাশছে। বাইরে তাহলে কে! বারান্দায় এসে দেখে, প্রথম রোদের একফালি এসে পড়েছে সেখানে, কেদারায় কেউ নেই!! চোখের ভুল!! দুপুরে খাওয়াদাওয়ার পর দাদু বই পড়েন ঘরে শুয়ে, দিম্মু ভাতঘুম ঘুমান, অপু উঠানে খেলা করে আপন মনে, কোকিল খোঁজে গাছের পাতার আড়ালে, আরামকেদারা এখন বারান্দার ছায়ায়, সকালে দাদাই ওখানে বসে চা খেয়েছিল, এখন ওখানে বসে খবরের কাগজ পড়ছে। অনেকক্ষণ দৌড়াদৌড়ি করে অপু পাখিটাকে দেখতে পেল, ও আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল “দাদাই দেখতে পেয়েছি গো “, দাদাই উত্তর দিল না কিন্তু কাগজ ভাঁজ করার শব্দে অপু বুঝল দাদাই দেখছে। সে লাফাতে লাফাতে সারা উঠোনে করতে লাগল।
দিম্মুর বোধহয় ঘুম ভেঙে গিয়েছিল অপুর চিৎকারে, তিনি হাসতে লাগলেন বললেন ” ওরে তুই তো পাখি দেখে হনুমান হয়ে গেলিরে! তোর দাদু কুম্ভকর্ণ, তোর চিৎকারে ও ঘুম ভাঙলো না। “অপু চমকে পিছনে তাকাল ” চেয়ার ফাঁকা কেউ নেই। শুধু কাগজটা ভাঁজকরা অবস্থায় কেদারার হাতলে রইছে। অপু ছুট্টে গেল দাদুর ঘরে, বুকের উপর বই উপুড় করা, চশমা চোখেই দাদু হাঁ করে ঘুমুচ্ছে!! নাহ! এটা কিছুতেই চোখের ভুল নয়… অপু অন্যমনস্ক হয়ে ঘুরে বেড়ালো সারা বাড়ি। পরদিন ভোরে সে কাউকে দেখতে পেল না। দুপুরেও অপু উৎসুক হয়ে রইল। কেউ এল না। সবই ভুল তাহলে। কাল অপু বাড়ি চলে যাবে মাম্মা নিতে আসবে, কাল বড়দাদাইয়ের মৃত্যুবার্ষিকী, মানে একরকমের পূজো আর কি।
পরদিন সবাই ভোরে উঠেছে, অপু চলে গেছে দাদাইয়ের পিছনের বাগানে, বড় সুন্দর এখানটা আমগাছে কচি কচি আম ধরেছে, জামরুলেও ফুল ধরেছে। রক্তজবাগাছটায় শুধু ফুল, খুব কম পাতা দেখা যাচ্ছে, অপু ফুল ফল ছেঁড়া পছন্দ করে না, গাছের হাতের নাগালের ফুলে হাত বোলায়। তখনই দাদুকে দেখতে পেল অপু আজ দাদু নতুন হালকা হলুদপাঞ্জাবি পরেছে, নতুন ধুতি, নিচু হয়ে ঝরে যাওয়া কচি আম কুড়াচ্ছে। দাদুকে আজ বেশ ফ্রেস লাগছে, চলাফেরায় দ্রুততা। অপু আজও ভোরে অপেক্ষা করেছিল কিন্তু কাউকে দেখে নি। মাম্মাকে বললে মাম্মা বলবে “গাছের পাতার আলোছায়ার খেলায় ও একরকম দৃষ্টিভ্রম। ” কিন্তু অপুর মন মানে না, অপু ও দাদাইয়ের মত ফুল- আম তুলতে লাগল, কি সুন্দর গন্ধ, আহারে ঝরে গেছে অকালে। তার ছায়াটা দাদাইয়ের পা ছুঁয়ে ফেলেছে কিন্তু সে নিচু হয় আম তুলতে গিয়ে খেয়াল করল, কি আশ্চর্য দাদাইয়ের ছায়া কোথায়! শুধু দাদাই, দাদাইয়ের কোন ছায়া নেই….।
তখনই ভিতর থেকে দিম্মুর গলা শোনা গেল।” আরে তুমি ও রকম টানাটানি করছ কেন মালাটা ছিঁড়ে যাবে যে, সবেতে তোমার তাড়াহুড়ো, ছবিটা নামিয়ে এনে মালাটা পরাও না, “… এমন করে কথা দিম্মু কাকে বলছে! একটু অবাক হল অপু, এমন করে কথা তো দিম্মু একমাত্র দাদাইয়ের সঙ্গেই বলে! তবে ! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দাদাইয়ের পাঞ্জাবিটা একটা লেবু গাছে আটকেছে এমা টান লেগে ছিঁড়ে গেল যে! দিম্মু ডাকল ” অপু ভাই তুমি কোথায়, এস ঠাকুরমশাই এসে গেছেন। “
অপু দৌড় লাগল আর ডাকল “দাদাই চলে এসো , দিম্মু বকবে কিন্তু! ” ঘরে এসে অপুর পা আটকে গেল চৌকাঠে, দাদাই একটা ছবিতে মালা পরাচ্ছে! সে সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে বাইরে তাকালো, কাউকে দেখতে পেল না। সে অন্যমনস্ক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ঠাকুরমশাই পূজা করতে লাগলেন, পূজা শেষ হতে সবাই নমস্কার করল ছবিটাকে। অপুও করল আর তখনই খেয়াল করল দূরে দেওয়ালে টাঙানো থাকে বলে ছবিটা এতদিন সে খেয়াল করেনি বড়দাদাইয়ের পাঞ্জাবিটা সেই হলুদ আর নতুন ধুতি, তাইতো অনেকটা দাদাইয়ের মতই তো দেখতে, তবে কি সে যাকে দেখে তিনি বড়দাদাই!
সারাদিন আনমনা হয়ে রইল। সবই তার মনের ভুল? বিকেলে সে বাগানে গেল সেইখানে যেখানে সে বড়দাদাইকে দেখেছিল, একটা কলাপাতায় অনেকগুলো কচি আম রইছে। অপু ওগুলোর কিছু মুঠোয় তুলে নিল। এবার রওনা হতে হবে বাড়ি ফিরতে হবে, ফেরার সময় চোখ আটকে গেল লেবুগাছটার দিকে, একটু জায়গায় আটকে আছে ছোট্ট হলুদ কাপড়ের টুকরো, তুলে নিল হাতে।
হাসি ফুটল অপুর মুখে, সে মিথ্যে দেখে নি, বড়দাদাইকে সত্যিই সে দেখেছে। কেউ বিশ্বাস করবে না কিন্তু সে ঠিক দেখেছে। অপু মাম্মার হাত ধরে রওনা হল, দিম্মু বাইরের গেট ধরে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছে। মোড় ঘোরার আগে অপু আর মাম্মা পিছন ফিরে একবার তাকায়, অপু দেখল দিম্মার ঠিক পিছনে গাছের তলায় আরামকেদারায় বসে আছেন সেই মানুষটি, আজ প্রথম মুখটা পরিস্কার দেখা গেল, সে বলল “মাম্মা দেখ “। মাম্মা বলল ” কি রে দিম্মুর জন্য মনকেমন করছে, আবার ছুটিতে আসবি। টা টা করে দে। ” অপু বুঝল মা দেখেনি। সে হাসল আর হাত নাড়ল আর আজ সেই বড়দাদাই ও হাত নাড়লেন তাকে দেখে। যতক্ষণ তাকে দেখা গেল অপু হাত নাড়ল আর একটা খুশির হাসি তার মুখে, মুঠোয় ধরা আছে কচি আম আর এক টুকরো হলুদ কাপড়।।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments